2018-01-17 10:14:06p

রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নিতে হবে: খালেদা জিয়া

আইএনবি ডেস্ক: রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কেবল ত্রাণ দিয়ে সবকিছুর সমাধান হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘শুধু কথায় হবে না। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ ধনী দেশ নয়। তবে এই দেশের মানুষের মন আছে। গরিব হলেও নিজের পকেট থেকে যে যা পারছে সাহায্য সহযোগিতা করছে, যা দীর্ঘকাল বহন করা সম্ভব নয়।’ সোমবার দুপুর সোয়া একটার দিকে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ময়নারগোনা-কাটাখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণকালে তিনি এই আহ্বান জানান।

এরপর সাড়ে তিনটার দিকে একই উপজেলার পানপাড়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য বিএনপিপন্থী চিকিৎসক সংগঠন ড্যাব আয়োজিত একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প উদ্বোধন করার পরও কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের প্রতি জোর দেওয়ার জন্য সরকারকে আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘অবিলম্বে মানবতার খাতিরে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জন্য যেমন কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার। তেমনি আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও এই দায়িত্ব নিতে হবে।’

এর আগে সোমবার সকালে উখিয়ার উদ্দেশে কক্সবাজারের সার্কিট হাউজ থেকে রওয়ানা হন খালেদা জিয়া। উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে-স্থানে স্থানীয় অধিবাসী, বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানান। রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় প্রবেশের পর রোহিঙ্গারাও রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ভাঙা-ভাঙা বাংলায় ‘জয় খালেদা জিয়া’ বলে স্লোগান দেয়।

সোমবার দুপুরে কাটাখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ করেন খালেদা জিয়া। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, শামসুজ্জামান দুদু, মোহাম্মদ শাহজাহান, উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসসহ কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য শেষ করে খালেদা জিয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে কথা বলেন এবং একটি রোহিঙ্গা শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করেন।

‘রোহিঙ্গাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি’

খালেদা জিয়া বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, ‘আমরা আজ সরেজমিনে রোহিঙ্গাদের দেখতে এসেছি। যারা ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন ও সম্পদ হারিয়ে সীমাহীন অত্যাচার সহ্য করে এদেশে এসেছেন, তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানাই।’

রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘হত্যা নির্যাতনে বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গারা পরিবার পরিজন নিয়ে এদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের অনেকেই তাদের স্বামী সংসার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। তারা বাংলাদেশে আসার পর থেকে টেকনাফ উখিয়ায় আমাদের দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেই, যেন তারা এই রোঙ্গিাদের পাশে দাঁড়ান। এরপর রোহিঙ্গারা দেশে আসার পর নেতাকর্মীরা নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।’

খালেদা জিয়া এ সময় জানান, তিনি গত ২৮ আগস্ট প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘শুরুতেই আমি বিবৃতি দেই, যেন এখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আমি দাবি জানাই, তারা যেন মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে। সেই লক্ষ্যে সরকারকে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জানানোর আহ্বান জানাই।’

বিএনপি প্রধানের ভাষ্য, ‘হত্যা নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি বিশ্ববাসীকেও আহ্বান জানিয়েছি। এরপরই বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের এখানে আশ্রয় দেয়।’ তিনি যুক্ত করেন, ‘এরপর বিশ্বের কয়েকটি দেশ রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তারা রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা নির্যাতন বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়।’

ত্রাণের বর্ণনা দিলেন খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা মানবিক কারণে তাদের ভাতা শিশুখাদ্য ও প্রসূতিদের প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েছি। মসজিদের ব্যবস্থাও করছি। শুধু তাদের এসব দিলেই হবে না তাদের স্বাস্থ্যেরও প্রয়োজন আছে যেহেতু তারা নানাভাবে নির্যাতিত হয়ে এসেছে। সে জন্য প্রথম থেকেই আমাদের চিকিৎসাসেবায় আমাদের রিলিফ ক্যাম্প আমার নির্দেশে ড্যাব কাজ করছে। যার ফলে মেডিক্যাল কার্যক্রম সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নারী ও শিশুদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের পক্ষে রিলিফ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারব না। তাই ১১০ টন চাল সেনাবাহিনীর কাছে দিয়েছি। যেন তারা সেটা রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করতে পারে। পাঁচ হাজার শিশু ও প্রসূতিদের জন্য রিলিফ আমাদের মেডিক্যাল ক্যাম্পে দেব। তারা সেখান থেকে এসব গ্রহণ করবে।

‘সরকারের ত্রাণ তৎপরতা নেই’

নিজের দলের ত্রাণ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা বিএনপি যেভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছি, সরকারের এমন ত্রাণ তৎপরতা লক্ষ করছি না। আমি মনে করি, যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, তাদের আরও বেশি করে এগিয়ে আসা উচিত। সমস্যা নিরসনে সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার।’

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা জানেন, বাংলাদেশ একটি মধ্যমআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব না। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতিসংঘ এবং ওআইসিসহ সারা বিশ্বে বড় রাষ্ট্রগুলোর কাছে আহ্বান করব, তারা জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। যেন তারা নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে নিজ দেশে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতে পারে, ব্যবসা করতে পারে।’

সরকারের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই সরকারের যেখানে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল, সেভাবে তারা কিছুই করতে পারেনি। উল্টো যারা কাজ করতে চায়, তাদের বাধা দিয়েছে।’

বিএনপির দাবিতে সেনা মোতায়েন

খালেদা জিয়ার ভাষ্য, ‘এই রোহিঙ্গারা এসেছে কিন্তু তাদের আশ্রয় দেওয়া হতো না। সে জন্যই আমরা দাবি করেছিলাম, তাদের সমস্যা সমাধানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা দরকার। আমাদের দাবি অনুযায়ী এখানে সেনাবাহিনী মোতায়ন করেছে। তাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। সেনাবাহিনীকে এখানে থাকতে হবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘এর আগেও আমরা রোহিঙ্গাদের অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছি। আমরা আমাদের সাহায্য চালিয়ে যাচ্ছি। সুন্দরভাবে রিলিফ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাব।’ এ সময় খালেদা জিয়া গণমাধ্যম ও বিএনপির নেতাকর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান।

খালেদা জিয়া সোমবার রোহিঙ্গাদের তিনটি ক্যাম্প ও একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এরপর বিকাল চারটার দিকে কক্সবাজার সার্কিট হাউজে ফেরেন। সেখানেই দুপুরে খাবার খেয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

আইএনবি: এমটি